আদম (আ.) – পর্ব ৩
শয়তানের ধোঁকা ও নিষিদ্ধ বৃক্ষ
জান্নাতের সেই শান্তির বাগানে আদম ও হাওয়া (আলাইহিমাস সালাম) একে অপরের সান্নিধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন নিখুঁত এক জীবন। সেখানে কোনো শূন্যতা ছিল না, ছিল কেবল অনাবিল প্রশান্তি। কিন্তু এই সুখ, এই নির্মল আনন্দ আর ভালোবাসার দৃশ্য অসহ্য হয়ে উঠেছিল একজনের কাছে। সে—অভিশপ্ত ইবলিস।
জান্নাতের বাইরে থেকে সে দেখছিল আদমের এই সম্মান আর সুখ। তার ভেতরটা হিংসার আগুনে জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছিল। যে আদমকে সিজদা না করার কারণে সে বিতাড়িত, সেই আদম কি না তার চোখের সামনে আল্লাহর শ্রেষ্ঠ নিয়ামত ভোগ করছে! এই দৃশ্য তাকে পাগল করে তুলেছিল। সে মনে মনে এক ভয়ংকর শপথ নিল—যেভাবেই হোক, আদমের এই সুখের বাগান সে ধ্বংস করবেই।
ইবলিস জানত, সে জোর করে আদম ও হাওয়ার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। তার কাছে অস্ত্র ছিল মাত্র একটি—ধোঁকা ও কুমন্ত্রণা। আল্লাহ যে একটি মাত্র গাছের কাছে যেতে বারণ করেছেন, ইবলিস তার সমস্ত পরিকল্পনা সাজালো সেই গাছটিকে ঘিরেই।
শয়তানের ধোঁকার এ এক অদ্ভুত ধরণ। সে কখনো পাপকে পাপ হিসেবে দেখায় না, বরং দেখায় এক বিরাট প্রাপ্তি হিসেবে। সে কুমন্ত্রণা দেয় শুভাকাঙ্ক্ষীর বেশে। [১] সে আদম ও হাওয়ার কাছে এসে ফিসফিস করে তাদের মনে এক নতুন প্রশ্ন জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করলো। তার গলায় ছিল যেন রাজ্যের মায়া। সে বললো, ‘আচ্ছা, ভেবে দেখেছো কি, আল্লাহ কেন তোমাদের ঠিক এই গাছটার কাছেই আসতে নিষেধ করেছেন? এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো বড় রহস্য আছে!’
প্রথমে তারা তার কথায় কান দিলেন না। আল্লাহর স্পষ্ট নির্দেশ তাদের সামনে ছিল। কিন্তু ইবলিস বারবার ফিরে আসতে লাগলো। সে তাদের মনের ভেতরে দুটি লোভনীয় স্বপ্ন এঁকে দিল। সে এমনভাবে কথাগুলো সাজালো, যেন আল্লাহ তাদের থেকে কোনো বড় নিয়ামত আড়াল করে রেখেছেন।
সে বলল: “তোমাদের রব তোমাদের এই গাছটি থেকে নিষেধ করেছেন কেবল এ কারণে যে, (এর ফল খেলে) তোমরা ফেরেশতা হয়ে যাবে, অথবা তোমরা এখানে চিরস্থায়ী হয়ে যাবে।” [২]
ফেরেশতার মতো নিষ্পাপ জীবন অথবা এই জান্নাতে চিরকাল থাকার আকাঙ্ক্ষা! ইবলিস তাদের সামনে এমন এক লোভনীয় প্রস্তাব রাখলো, যা মানুষের চিরন্তন চাওয়া। কিন্তু আদম ও হাওয়া তখনো দ্বিধান্বিত। আল্লাহর আদেশ ভাঙার কথা তারা ভাবতেও পারছিলেন না।
ইবলিস যখন দেখলো, তার কথায় কাজ হচ্ছে না, তখন সে তার সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্রটি প্রয়োগ করলো।
সে আল্লাহর নামে কসম খেয়ে বলল: “আমি অবশ্যই তোমাদের দুজনের জন্য একজন হিতাকাঙ্ক্ষী।” [৩]
কেমন ছিল সেই মুহূর্তটা? আদম ও হাওয়ার ভাবনার জগতটা ছিল পবিত্র। সেখানে কেউ আল্লাহর নামে কসম করে মিথ্যা বলতে পারে, এই ধারণাটাই ছিল তাদের কাছে অচিন্তনীয়। তাদের সরল ও নিষ্পাপ মন এই চূড়ান্ত ধোঁকায় বিশ্বাস স্থাপন করলো। তারা ভাবলেন, যে মহান আল্লাহর নামে শপথ করে, সে নিশ্চয়ই তাদের অকল্যাণ চাইতে পারে না।
এটি ছিল এক মানবিক দুর্বলতার মুহূর্ত, এক মুহূর্তের বিস্মৃতি। আল্লাহ আদম (আ.) সম্পর্কে বলেছেন যে, তিনি ভুলে গিয়েছিলেন। [৪] এটি ইবলিসের মতো ইচ্ছাকৃত বিদ্রোহ ছিল না, বরং ছিল এক গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হওয়া।
অবশেষে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটি এলো। তারা দুজনেই সেই নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়ে ফেললেন।
আর ফলটি মুখে দেওয়ার সাথে সাথেই ঘটলো বিপর্যয়! এক মুহূর্তে সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল। যে ঐশ্বরিক পোশাক তাদের শরীরকে আবৃত করে রেখেছিল, তা অদৃশ্য হয়ে গেল। তারা প্রথমবারের মতো নিজেদের শারীরিক গঠন দেখলেন এবং এক তীব্র লজ্জায় ছেয়ে গেলেন। কী করবেন, বুঝতে না পেরে তারা জান্নাতের গাছের পাতা ছিঁড়ে নিজেদের শরীর ঢাকার জন্য দিগ্বিদিক ছুটতে লাগলেন। [৫]
এক পলকে তাদের সেই অনিন্দ্য সুন্দর, নিশ্ছিদ্র শান্তির জীবনে এক কালো দাগ পড়ে গেল। জান্নাতের নির্মল আনন্দ এক মুহূর্তে তীব্র লজ্জা আর ভয়ে পরিণত হলো। তাদের সুখের নীড় কেঁপে উঠলো। তারা বুঝতে পারলেন, তারা এক ভয়ংকর ভুল করে ফেলেছেন।
কিন্তু এরপর কী হলো? নিজেদের এই ভুলের জন্য তারা কি ইবলিসের মতো অহংকার দেখালেন? আর তাদের রব, যিনি সবকিছুই দেখছিলেন, তিনি তাদের সাথে কী আচরণ করলেন? সেই পরিণতির গল্পই আমরা জানব পরের পর্বে, ইন শা আল্লাহ।
.
রেফারেন্স:
[১] সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত: ২০।
[২] সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত: ২০।
[৩] সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত: ২১।
[৪] সূরা ত্বোয়া-হা, আয়াত: ১১৫।
[৫] সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত: ২২।