পাপ, অনুশোচনা ও পৃথিবীতে আগমন

জান্নাতের গাছের পাতা দিয়ে কোনোমতে নিজেদের আব্রু ঢাকার চেষ্টা করছেন আদম ও হাওয়া (আলাইহিমাস সালাম)। যে জান্নাত ছিল তাদের জন্য প্রশান্তির নীড়, সেই জান্নাতই যেন এখন তাদের কাছে এক অচেনা, ভয়ের জায়গা। 

প্রতিটা পাতার মর্মর শব্দেও যেন তারা কেঁপে উঠছেন। তাদের হৃদয়জুড়ে কেবল তীব্র অনুশোচনা আর হাহাকার। এক মুহূর্তের ভুল, এক মুহূর্তের বিস্মৃতি তাদের সুখের জীবনকে ওলটপালট করে দিয়েছে।

ঠিক তখনই, সেই ভয় আর লজ্জার নীরবতা ভেঙে দিয়ে ভেসে এলো তাদের রবের কণ্ঠস্বর। 

আল্লাহ তাদের ডেকে বললেন: “আমি কি তোমাদের উভয়কে ওই গাছটির কাছে যেতে বারণ করিনি এবং বলিনি যে, শয়তান তোমাদের উভয়ের প্রকাশ্য শত্রু?” [১]

আল্লাহর এই কথা শোনার পর তাদের আর কোনো কিছুই বলার থাকলো না। ইবলিস তাদের ধোঁকা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আল্লাহর স্পষ্ট আদেশ তো তাদের সামনে ছিল। সেই আদেশ অমান্য করার দায়ভার সম্পূর্ণ তাদের নিজেদের।

ভুল মানুষ করে, ভুল ফেরেশতাদের ঊর্ধ্বে থাকা জিনও করে। কিন্তু ভুলের পর নির্ধারিত হয় তার প্রতিক্রিয়া দিয়ে—আর এখানেই ফুটে উঠলো আদম (আঃ) আর ইবলিসের মধ্যকার আকাশ-পাতাল পার্থক্য। ইবলিস তার ভুলের জন্য যুক্তি দাঁড় করিয়েছিল, অহংকার দেখিয়েছিল এবং নিজের ভুলের দায়ভার চাপিয়েছিল আল্লাহর ওপর। [২]

আর আদম (আঃ)? তিনি কোনো অজুহাত খুঁজলেন না, কোনো যুক্তি দাঁড় করালেন না। লজ্জায়, ভয়ে আর অনুতাপে নুয়ে পড়লেন। তারা বুঝতে পারলেন, এই মুহূর্তে নিজেদের বাঁচানোর একটাই পথ খোলা আছে—আর তা হলো, সেই রবের কাছেই ফিরে যাওয়া, যাঁর আদেশ তারা অমান্য করেছেন।

কিন্তু কীভাবে ক্ষমা চাইতে হবে, কোন ভাষায় নিজেদের এই গভীর অনুশোচনা প্রকাশ করতে হবে, তা-ও তারা জানতেন না। তখন পরম দয়ালু আল্লাহ নিজেই তাদের প্রতি করুণা করলেন। তিনি তাদের এমন কিছু শব্দ শিখিয়ে দিলেন, যা দিয়ে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারে। [৩]

আদম ও হাওয়া (আঃ) অশ্রুসিক্ত চোখে, ভাঙা হৃদয়ে সেই শেখানো ভাষায় আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করলেন। 

মানব ইতিহাসের প্রথম সেই দোয়াটি ছিল: “হে আমাদের রব, আমরা আমাদের নিজেদের উপর জুলুম করেছি। আর যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদের উপর দয়া না করেন, তবে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।” [৪]

এই দোয়ার প্রতিটি শব্দে ছিল পূর্ণ আত্মসমর্পণ। ‘আমরা ভুল করেছি’—এই সরল স্বীকারোক্তিই ছিল তাদের মুক্তির প্রথম সোপান।

আল্লাহ তা‘আলা, যিনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তিনি তাঁর প্রিয় বান্দাদের এই অনুশোচনা কবুল করলেন। তিনি তাদের ক্ষমা করে দিলেন। [৫]

কিন্তু আল্লাহর ক্ষমা মানে এই নয় যে, কাজের পার্থিব পরিণতি মুছে যাবে। পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করার জন্যই তাদের সৃষ্টি করা হয়েছিল। এই ঘটনাটিই ছিল সেই দায়িত্বের পথে যাত্রার সূচনা। আল্লাহ তাদের পৃথিবীতে নেমে যাওয়ার আদেশ দিলেন। 

তিনি বললেন: “তোমরা সকলে (এখান থেকে) নেমে যাও। তোমরা একে অপরের শত্রু। পৃথিবীতেই তোমাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বাসস্থান ও জীবনযাপনের উপকরণ রয়েছে।” [৬]

তবে আল্লাহ তাদের অসহায়ভাবে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেননি। তিনি তাদের সাথে এক মহিমান্বিত ওয়াদা করলেন। 

তিনি বললেন: “অতঃপর যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে কোনো হেদায়েত (পথনির্দেশ) পৌঁছাবে, তখন যারা আমার সেই হেদায়েত অনুসরণ করবে, তাদের কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা চিন্তিতও হবে না।” [৭]

এই ছিল মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বড় আশার বাণী। পৃথিবীতে পথ চলতে গিয়ে মানুষ ভুল করবে, হোঁচট খাবে, কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে সবসময়ই পথ দেখানোর জন্য আসবে তাঁর নির্দেশনা।

অবশেষে সেই মুহূর্তটি এলো। যে শুক্রবারে আদম (আঃ)-কে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছিল, সেই শুক্রবারেই তাকে সেখান থেকে পৃথিবীতে নামিয়ে দেওয়া হলো। [৮] জান্নাতের চিরচেনা পথ, চেনা আকাশ পেছনে ফেলে তারা নেমে এলেন এক অজানা, অচেনা পৃথিবীতে। এক নতুন পরীক্ষা।

কিন্তু নিয়তি তাদের জন্য কী লিখে রেখেছিল? তারা কি একসাথে ছিলেন? নাকি এই পৃথিবীতে তাদের প্রথম পরীক্ষাটিই ছিল একে অপরকে খুঁজে পাওয়ার এক দীর্ঘ আর নিঃসঙ্গ লড়াই? সেই গল্পই আমরা জানব আমাদের পরবর্তী পর্বে।

.

রেফারেন্স:

[১] সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত: ২২।

[২] সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত: ১৬।

[৩] সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৩৭।

[৪] সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত: ২৩।

[৫] সূরা ত্বোয়া-হা, আয়াত: ১২২।

[৬] সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত: ২৪।

[৭] সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৩৮।

[৮] সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ৮৫৪।

Leave a Reply