আদম (আ.) – পর্ব ৫
আদম ও হাওয়া–এর বিচ্ছিন্নতা ও পুনর্মিলন
জান্নাতের সেই চিরচেনা, ভালোবাসার নীড় ছেড়ে আদম ও হাওয়া (আলাইহিমাস সালাম) নেমে এলেন পৃথিবীতে। কিন্তু এ কোন পৃথিবী! এখানে জান্নাতের সেই স্নিগ্ধ আলো নেই, নেই সেই পরিচিত সুর। চারদিকে কেবল এক অজানা, অচেনা পরিবেশ। আর সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি ছিল—তারা একা। একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন।
ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় এসেছে, আদম (আঃ)-কে অবতরণ করানো হয়েছিল বর্তমান শ্রীলঙ্কার এক পাহাড়ে, যা আজ ‘আদম চূড়া’ নামে পরিচিত। আর হাওয়া (আঃ) অবতরণ করেছিলেন বর্তমান সৌদি আরবের জেদ্দায়। [১]
ভাবা যায় সেই মুহূর্তটার কথা? যে আদম ও হাওয়া এক মুহূর্তের জন্যও একে অপরকে ছেড়ে থাকতেন না, আজ তাদের মাঝে শত শত মাইলের বিশাল ব্যবধান। জান্নাতের সেই মধুর সঙ্গ হারিয়ে এই নিঃসঙ্গ পৃথিবীতে তাদের দিনগুলো কেমন কেটেছিল? চারদিকে ভয়, অন্ধকার আর অজানা শঙ্কা। আর তার চেয়েও বড় কষ্ট ছিল প্রিয় সঙ্গীকে হারানোর বেদনা।
তাদের সম্বল ছিল কেবল দুটি জিনিস—আল্লাহর ক্ষমা এবং তাঁর পক্ষ থেকে দেওয়া সেই ওয়াদা যে, তিনি তাদের পথ দেখাবেন।
তারা দুজনেই নিজেদের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করতে লাগলেন। আর ব্যাকুল হয়ে একে অপরকে খুঁজতে শুরু করলেন। কত দিন, কত মাস, কত বছর যে এভাবে কেটে গেল, তার কোনো সঠিক হিসাব নেই। পাহাড়, জঙ্গল, মরুভূমি—সব জায়গায় তারা একে অপরকে খুঁজে বেড়াতেন। এই দীর্ঘ বিচ্ছেদ ছিল তাদের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। এই পরীক্ষার মাধ্যমে আল্লাহ হয়তো তাদের একে অপরের প্রতি ভালোবাসা আর নির্ভরতার মূল্য আরও গভীরভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন।
অবশেষে, সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটলো। আল্লাহর অশেষ করুণায়, আরাফাতের ময়দানে তাদের পুনর্মিলন ঘটলো। [২] ‘আরাফাত’ শব্দের একটি অর্থই হলো ‘পরিচিত হওয়া’। এই ময়দানেই তারা একে অপরকে নতুন করে খুঁজে পেলেন, পরিচিত হলেন।
কেমন ছিল সেই পুনর্মিলনের মুহূর্ত? শত শত বছরের নিঃসঙ্গতা আর অপেক্ষার পর প্রিয় সঙ্গীকে খুঁজে পাওয়ার সেই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তাদের চোখ থেকে হয়তো গড়িয়ে পড়েছিল আনন্দের অশ্রু। তারা একসাথে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন, যিনি তাদের এই কঠিন পরীক্ষায় ধৈর্য ধারণ করার তৌফিক দিয়েছেন এবং অবশেষে তাদের আবার মিলিয়ে দিয়েছেন।
আদম ও হাওয়া (আঃ)-এর এই বিচ্ছেদ ও পুনর্মিলনের ঘটনায় আমাদের জন্য লুকিয়ে আছে এক গভীর শিক্ষা। দুনিয়ার জীবনটাই আসলে একটা পরীক্ষার জায়গা। এখানে আমরা প্রতিনিয়ত নানা ধরনের কষ্ট, বিচ্ছেদ আর প্রতিকূলতার মুখোমুখি হব। কখনো আমরা আমাদের প্রিয়জনকে হারাব, কখনো একাকীত্বের অন্ধকারে ডুবে যাব।
কিন্তু এই কঠিন সময়ে আমাদের হতাশ হলে চলবে না। আদম ও হাওয়া (আঃ) যেমন আল্লাহর উপর ভরসা রেখেছিলেন এবং তাঁর কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন, আমাদেরও তেমনি করতে হবে। আল্লাহর করুণা থেকে নিরাশ হওয়া মুমিনের কাজ নয়। তিনি যেমন আদম ও হাওয়াকে মিলিয়ে দিয়েছিলেন, তেমনি তিনিও আমাদের সব কষ্ট দূর করে দিতে পারেন।
তাদের এই পুনর্মিলন কেবল দুটি মানুষের মিলন ছিল না, ছিল পৃথিবীতে মানব সভ্যতার আনুষ্ঠানিক সূচনা। আরাফাতের ময়দানে তাদের এই মিলনই পৃথিবীতে আমাদের সকলের যাত্রার প্রথম পদক্ষেপ।
তারা একসাথে তাদের নতুন জীবন শুরু করলেন। পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য যা যা প্রয়োজন, আল্লাহ তাদের সবকিছুই শিখিয়ে দিলেন। আদম (আঃ) শিখলেন কীভাবে চাষাবাদ করতে হয়, কীভাবে আগুন জ্বালাতে হয়। হাওয়া (আঃ) শিখলেন কীভাবে ঘর সামলাতে হয়। তারা একসাথে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে শুরু করলেন।
তাদের এই নতুন জীবনে এরপর কী ঘটলো? কীভাবে তাদের মাধ্যমে পৃথিবীতে মানবজাতির বিস্তার শুরু হলো? সেই গল্পই আমরা জানব আমাদের পরবর্তী পর্বে।
.
রেফারেন্স:
[১] আত-তাবারী, ইবনে কাসীর এবং অন্যান্য ঐতিহাসিকদের বর্ণনার ভিত্তিতে। তবে অবতরণের স্থান নিয়ে একাধিক মত প্রচলিত আছে।
[২] তাফসীর ও ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, যেমনটি ইমাম তাবারী উল্লেখ করেছেন।