আদম (আ.) – পর্ব ৬
সন্তানদের জন্ম ও মানব ইতিহাসের শুরু
আরাফাতের ময়দানে সেই আবেগঘন পুনর্মিলনের পর আদম ও হাওয়া (আলাইহিমাস সালাম) পৃথিবীতে তাদের নতুন জীবন শুরু করলেন। জান্নাতের সেই স্মৃতি বুকে নিয়ে তারা আল্লাহর উপর ভরসা করে পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে লাগলেন।
আল্লাহ তাদের শিখিয়ে দিলেন পৃথিবীতে বেঁচে থাকার নানা কৌশল। আদম (আঃ) হলেন পৃথিবীর প্রথম কৃষক ও কারিগর, আর হাওয়া (আঃ) হলেন প্রথম গৃহিণী। তাদের হাত ধরেই পৃথিবীতে শুরু হলো মানব সভ্যতার পথচলা।
তাদের এই নতুন জীবনকে পূর্ণতা দিতে আল্লাহর পক্ষ থেকে এলো সবচেয়ে বড় নিয়ামত—সন্তান। হাওয়া (আঃ)-এর কোল জুড়ে একে একে আসতে শুরু করলো তাদের সন্তানেরা।
ঐতিহাসিকদের বর্ণনা অনুযায়ী, আল্লাহ তাদের এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় সন্তান দান করেছিলেন। প্রতিবার হাওয়া (আঃ)-এর গর্ভে জন্ম নিতো এক জোড়া জমজ সন্তান—একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। [১]
এভাবেই তাদের ঘর আলো করে এলো প্রথম জোড়া সন্তান, এরপর দ্বিতীয় জোড়া, তারপর তৃতীয়। ধীরে ধীরে পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা বাড়তে লাগলো।
এখানে একটি প্রশ্ন আসতেই পারে, মানবজাতির বিস্তার কীভাবে হয়েছিল? যেহেতু তখন সব মানুষই ছিল ভাই-বোন, তাদের মধ্যে বিয়ে হলো কীভাবে?
এর সমাধানও আল্লাহ নিজেই করে দিয়েছিলেন। তিনি সেই সময়ের জন্য, শুধুমাত্র সেই প্রথম প্রজন্মের জন্য, এক বিশেষ নিয়ম বা শরীয়ত নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন।
নিয়মটি ছিল, এক গর্ভের জমজ ভাই-বোন পরস্পরকে বিয়ে করতে পারবে না। বিয়ে করতে হবে অন্য গর্ভের জমজ ভাই বা বোনের সাথে। অর্থাৎ, প্রথম গর্ভের ছেলে বিয়ে করবে দ্বিতীয় গর্ভের মেয়েকে, আর দ্বিতীয় গর্ভের ছেলে বিয়ে করবে প্রথম গর্ভের মেয়েকে।
এটি ছিল মানবজাতিকে পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে তিনি যেমন মানবজাতির বংশবিস্তার নিশ্চিত করেছেন, তেমনি প্রথম থেকেই বিয়ের ক্ষেত্রে একটি ন্যূনতম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ‘মাহরাম’ বা নিষিদ্ধ সম্পর্কের একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছেন। এটি আমাদের শেখায় যে, ঐশ্বরিক আইন বা শরীয়ত সময়ের প্রয়োজনে পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু এর পেছনের মূল উদ্দেশ্য পবিত্রতা ও শৃঙ্খলা সবসময়ই অটুট থাকে।
আদম ও হাওয়ার সন্তানদের মধ্যেই ছিলেন তাদের দুই পুত্র, যাদেরকে নিয়ে মানব ইতিহাসের প্রথম হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছিল। কুরআনে তাদের নাম উল্লেখ না থাকলেও, ঐতিহাসিক বর্ণনায় তাদের নাম হিসেবে কাবীল ও হাবীল এসেছে। [২]
কাবীল ছিল প্রথম জমজ জোড়ার সন্তান এবং সে পেশায় ছিল একজন কৃষক। সে মাটির বুক চিরে ফসল ফলাতো। অন্যদিকে হাবীল ছিল দ্বিতীয় জমজ জোড়ার সন্তান এবং সে ছিল একজন পশুপালক। সে পশুদের যত্ন নিতো এবং তাদের নিয়ে মাঠে-ঘাটে চড়ে বেড়াতো।
দুজন ছিল দুই ভাই, কিন্তু তাদের চরিত্র ও মন-মানসিকতায় ছিল বেশ পার্থক্য। হাবীল ছিল শান্ত, ধর্মপ্রাণ এবং আল্লাহর প্রতি অনুগত। অন্যদিকে কাবীলের চরিত্রে ছিল কিছুটা রুক্ষতা আর অবাধ্যতার ছাপ।
আদম (আঃ) তার সব সন্তানকে আল্লাহর ভয় এবং ইবলিসের ধোঁকা সম্পর্কে শিক্ষা দিতেন। তিনি তাদের শোনাতেন জান্নাতের সেই ভুলের কথা, যাতে তার সন্তানেরা সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে। পৃথিবীতে মানব পরিবার ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিল। সবকিছু বাহ্যিকভাবে শান্তই ছিল।
কিন্তু ইবলিস কি থেমে ছিল? সে সরাসরি আর ধোঁকা দেওয়ার সুযোগ হয়তো পাচ্ছিল না, তাই সে মানুষের অন্তরের ভেতরেই এক নতুন বীজ বপন করার অপেক্ষায় ছিল। আর সেই অদৃশ্য বীজটির নাম ছিল—ঈর্ষা।
শিগগিরই সেই ঈর্ষার প্রথম আগুনের স্ফুলিঙ্গ দেখা দিল দুই ভাইয়ের মাঝে, যা মানব ইতিহাসের প্রথম গুনাহ ও প্রথম হত্যাকাণ্ডের জন্ম দিতে চলেছিল। সেই মর্মান্তিক ঘটনার কথাই আমরা জানব আমাদের পরবর্তী পর্বে।
.
রেফারেন্স:
[১] তাফসীর ইবনে কাসীর, তাফসীরে তাবারী এবং অন্যান্য ঐতিহাসিকদের বর্ণনা অনুযায়ী। সন্তানের সঠিক সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মত প্রচলিত আছে, তবে জমজ হিসেবে জন্মের বর্ণনাটিই সর্বাধিক প্রসিদ্ধ।
[২] সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ২৭-৩১; নামগুলো ইসলামিক ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকে প্রাপ্ত।