আদম (আ.) – পর্ব ৭
কাবীল ও হাবীল: প্রথম ঈর্ষা ও হত্যা
পৃথিবীতে আদম (আঃ)-এর পরিবার ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিল। তাঁর সন্তানেরা বড় হচ্ছিল, শিখছিল পৃথিবীতে বেঁচে থাকার নিয়মকানুন। বাহ্যিকভাবে সবকিছু শান্তই ছিল। কিন্তু যে ইবলিস তাদের পিতামাতাকে ধোঁকা দিয়েছিল, সে কি থেমে ছিল?
সে এবার সরাসরি কুমন্ত্রণা না দিয়ে, মানুষের অন্তরের ভেতরেই এক নতুন বিষ বপন করলো। আর সেই বিষের নাম ছিল—ঈর্ষা।
সেই সময়ের ঐশ্বরিক নিয়ম অনুযায়ী, এক গর্ভের জমজ ভাইয়ের সাথে অন্য গর্ভের জমজ বোনের বিয়ে হতো। এই নিয়ম অনুযায়ী, কাবীলের ভাগে পড়া সঙ্গিনীর চেয়ে হাবিলের ভাগে পড়া সঙ্গিনী ছিলেন অধিক রূপবতী। কাবীলের মন এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারলো না। তার অন্তরে জন্ম নিল অসন্তোষ আর ভাইয়ের প্রতি তীব্র ঈর্ষা। মানব ইতিহাসের প্রথম সংঘাতের বীজ এভাবেই রোপিত হলো।
যখন এই বিরোধের কথা আদম (আঃ)-এর কাছে পৌঁছালো, তিনি এর সমাধানের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পথ বাতলে দিলেন। তিনি বললেন, তারা দুই ভাই যেন আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানী বা উৎসর্গ পেশ করে। আল্লাহ যার কুরবানী কবুল করবেন, তার ইচ্ছাই পূরণ হবে। [১]
কুরবানী বা যেকোনো ইবাদতের মূল ভিত্তি হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। আল্লাহ আমাদের সম্পদের মুখাপেক্ষী নন, তিনি দেখেন আমাদের অন্তরের নিয়ত। এই ঘটনাটিই তার প্রথম দৃষ্টান্ত।
হাবীল ছিল একজন পশুপালক। সে তার পালের সবচেয়ে সেরা এবং মোটাতাজা পশুটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করলো। তার অন্তরে ছিল আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা আর তাঁর সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার আকুতি। অন্যদিকে কাবীল ছিল কৃষক। ঈর্ষা আর অহংকারে তার অন্তর ছিল কলুষিত। সে তার ক্ষেতের সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও অপ্রয়োজনীয় কিছু ফসল উৎসর্গের জন্য নিয়ে এলো। তার কাজে আল্লাহর প্রতি কোনো সম্মান বা আন্তরিকতা ছিল না।
আল্লাহ উভয়ের কুরবানীই দেখলেন। তখন আকাশ থেকে এক আগুন নেমে এসে হাবিলের কুরবানীটি গ্রহণ করে নিল, আর কাবীলের কুরবানীটি যেমন ছিল তেমনই পড়ে রইলো। [২] এটিই ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে রায়। আল্লাহর এই সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার পরিবর্তে কাবীলের অন্তর ঘৃণা ও প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে উঠলো। তার সমস্ত ক্রোধ গিয়ে পড়লো তার ভাই হাবিলের উপর। সে হাবিলকে সরাসরি বলে বসলো: “আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব।” [৩]
পৃথিবীর বুকে হত্যার প্রথম হুমকি। ভাইয়ের মুখ থেকে এই ভয়ংকর কথা শুনেও হাবিল একটুও বিচলিত হলেন না। তার জবাবে ফুটে উঠলো আল্লাহর প্রতি তার গভীর বিশ্বাস আর ভয়। সে শান্তভাবে উত্তর দিল: “আল্লাহ তো কেবল মুত্তাকীদের (সংযমীদের) পক্ষ থেকেই কবুল করেন। তুমি যদি আমাকে হত্যা করার জন্য আমার দিকে হাত বাড়াও, তবুও আমি তোমাকে হত্যা করার জন্য তোমার দিকে হাত বাড়াবো না। কেননা, আমি বিশ্বজগতের রব আল্লাহকে ভয় করি।” [৪]
হাবিলের এই জবাবে কাবিলের অহংকারে আরও বেশি আঘাত লাগলো। সে দেখলো, শুধু আল্লাহর কাছেই নয়, তাকওয়া আর মহত্ত্বের দিক থেকেও তার ভাই তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। এই উপলব্ধি তার ঈর্ষাকে চূড়ান্ত ক্রোধে পরিণত করলো। তার ভেতরের মনুষ্যত্বকে গ্রাস করে নিল তার অহংকারী সত্তা। তার আত্মা তাকে তার ভাইকে হত্যা করার জন্য প্ররোচিত করতে লাগলো। [৫] অবশেষে, সেই ভয়ংকর মুহূর্তটি এলো। কাবীল তার ভাই হাবিলকে হত্যা করলো।
পৃথিবীর বুকে প্রথমবার রক্ত ঝরলো। ভাইয়ের হাতে খুন হলো ভাই। মানব ইতিহাসের প্রথম শহীদ হলেন হাবীল, আর প্রথম হত্যাকারী হিসেবে কাবীলের নাম লেখা হয়ে গেল।
ক্রোধের আগুন যখন নিভে গেল, কাবিলের হুঁশ ফিরলো। সে তার ভাইয়ের নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে রইলো। একি করলো সে! এখন সে এই মৃতদেহ নিয়ে কী করবে? মৃত্যু কী, দাফন কী—কোনো কিছুই তখনও তার জানা ছিল না। তার বিজয় এক মুহূর্তে পরিণত হলো এক ভয়ংকর অসহায়ত্ব আর অনুশোচনায়।
সেই অসহায়ত্ব থেকে সে কীভাবে মুক্তি পেলো? আর আল্লাহ তাকে ও মানবজাতিকে মৃত্যুর পর করণীয় সম্পর্কে কী শিক্ষা দিলেন? সেই গল্পই আমরা জানব আমাদের পরবর্তী পর্বে।
.
রেফারেন্স:
[১] সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ২৭। ঘটনার প্রেক্ষাপট তাফসীর গ্রন্থসমূহ (যেমন: তাফসীর ইবনে কাসীর) থেকে প্রাপ্ত।
[২] তাফসীর গ্রন্থসমূহে বর্ণিত, সেই সময়ে কুরবানী কবুল হওয়ার নিদর্শন ছিল আকাশ থেকে আগুন এসে তা ভস্ম করে দেওয়া।
[৩] সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ২৭।
[৪] সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ২৭-২৮।
[৫] সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ৩০।