আদম (আ.) – পর্ব ২
হাওয়া (আ.) এর সৃষ্টি ও শান্তির আরম্ভ
কেমন ছিল সেই একাকীত্ব? চারদিকে আল্লাহর রহমতের বাগান—জান্নাত। অফুরন্ত নিয়ামত, মনোরম ঝর্ণাধারা, ফেরেশতাদের সঙ্গ। কোনো ক্লান্তি নেই, নেই কোনো অপূর্ণতার ছাপ।
কিন্তু এতকিছুর পরেও আদম (আলাইহিস সালাম)-এর মনে এক অদ্ভুত শূন্যতা। তিনি একা। তাঁর মতো কেউ নেই, যার সাথে তিনি কথা বলবেন, যার কাছে তাঁর মনের প্রশান্তি খুঁজে নেবেন। এই বিশাল জান্নাত তাঁর কাছে এক সুন্দর খাঁচার মতো মনে হতে লাগলো।
স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টির মনের খবর সবচেয়ে ভালো জানেন। তিনি দেখলেন তাঁর প্রিয় বান্দার এই নীরব আকুতি। তিনি চাইলেন আদমের এই একাকীত্বকে দূর করে দিতে, তাঁর জীবনকে ভালোবাসার চাদরে মুড়ে দিতে।
একদিন আদম (আ.) যখন ঘুমিয়ে ছিলেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এক মহাবিস্ময়কর ঘটনা ঘটালেন। তিনি আদমের বাম পাঁজরের একটি হাড় থেকে তাঁর সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করলেন। [১] আদম (আ.) যখন ঘুম থেকে জেগে উঠলেন, তিনি দেখলেন তাঁর পাশে বসে আছেন অপরূপ এক নারী। তাঁর চোখে-মুখে মায়া আর পবিত্রতার ছাপ।
আদম (আ.) অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কে?’ তিনি মিষ্টি হেসে উত্তর দিলেন, ‘আমি একজন নারী।’ আদম (আ.) আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনাকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে?’ তিনি জবাব দিলেন, ‘যাতে আপনি আমার মাঝে আপনার প্রশান্তি খুঁজে নিতে পারেন।’ [২]
এভাবেই মানব ইতিহাসের প্রথম ভালোবাসার জন্ম হলো। আদমের শূন্য জগৎ পূর্ণতায় ভরে গেল। আল্লাহ তাঁর এই সঙ্গিনীর নাম রাখলেন হাওয়া। কারণ, তাঁকে জীবন্ত (হাইয়্যু) সত্তা থেকে সৃষ্টি করা হয়েছিল।
আল্লাহ হাওয়া (আ.)-কে আলাদাভাবে মাটি থেকে সৃষ্টি করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি তাঁকে সৃষ্টি করেছেন আদমেরই দেহের একটি অংশ থেকে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন: “হে মানবজাতি, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি (নফস) থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন…” [৩]
এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর শিক্ষা। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেবল সামাজিক বা জৈবিক কোনো চুক্তি নয়, বরং এ হলো এক আত্মিক বন্ধন। একজন আরেকজনের অংশ। একজন ছাড়া আরেকজন অপূর্ণ। আল্লাহ তাদের সৃষ্টিই করেছেন একে অপরের মাঝে ‘সাকিনাহ’ বা গভীর প্রশান্তি খুঁজে পাওয়ার জন্য। আমাদের জীবনের এই সঙ্গীর উপস্থিতির উদ্দেশ্যই হলো একাকীত্বের অবসান ঘটানো এবং জীবনকে ভালোবাসায় পূর্ণ করা।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাওয়া (আ.)-এর সৃষ্টির পেছনের ঘটনাকে আমাদের জন্য এক চিরন্তন শিক্ষায় পরিণত করেছেন।
তিনি বলেন: “তোমরা নারীদের প্রতি কোমল আচরণ করো। কেননা, তাদেরকে পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পাঁজরের সবচেয়ে বাঁকা অংশ হলো তার ওপরেরটি। তুমি যদি তা জোর করে সোজা করতে যাও, তবে তা ভেঙে ফেলবে। আর যদি তাকে তার মতো ছেড়ে দাও, তবে তা বাঁকাই থেকে যাবে। তাই নারীদের প্রতি সদয় থাকো।” [৪]
এই হাদিসটি কোনোভাবেই নারীকে খাটো করার জন্য নয়। বরং এটি পুরুষকে তার সঙ্গিনীর মনস্তত্ত্ব বোঝার জন্য একটি ঐশ্বরিক নির্দেশনা। পাঁজরের হাড় যেমন বাঁকা থেকেই হৃৎপিণ্ডকে রক্ষা করে, নারীর আবেগ, অনুভূতি ও সংবেদনশীলতাও তার নিজস্ব ভঙ্গিতেই পরিবারকে আগলে রাখে। এখানে শিক্ষা হলো, সম্পর্কের যত্ন নিতে হয় জোর বা কঠোরতা দিয়ে নয়, বরং ভালোবাসা, ধৈর্য আর প্রজ্ঞা দিয়ে। এটিই হলো একটি সুখী ও প্রশান্তিপূর্ণ সম্পর্কের মূল ভিত্তি।
আদম ও হাওয়া (আ.) একসাথে জান্নাতে বসবাস করতে লাগলেন। তাঁদের জীবন ছিল নিখুঁত, নিশ্ছিদ্র এক আনন্দের। সেখানে ক্ষুধা ছিল না, তৃষ্ণা ছিল না, ছিল না কোনো কষ্ট বা চিন্তা। [৫] আল্লাহ তাঁদের দুজনকেই এক অফুরন্ত স্বাধীনতা দিলেন।
তিনি বললেন: “হে আদম! তুমি ও তোমার সঙ্গিনী জান্নাতে বসবাস করো এবং যেখানে ইচ্ছা স্বাচ্ছন্দ্যে খাও, কিন্তু এই গাছটির কাছেও যেও না। যদি যাও, তবে তোমরা জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।” [৬]
গোটা জান্নাতের সব নিয়ামত তাঁদের জন্য উন্মুক্ত। হাজারো রকম ফল, পানীয়, যা খুশি তারা ভোগ করতে পারতো। নিষেধ ছিল কেবল একটি। শুধু একটি গাছের কাছে যেতে বারণ করা হয়েছিল। পরীক্ষাটি খুব সহজ ছিল, কিন্তু এর পেছনের উদ্দেশ্য ছিল খুব গভীর—কারণ এটি ছিল আনুগত্যের পরীক্ষা।
আর এই একটি নিষেধাজ্ঞাকে ঘিরেই তার সব পরিকল্পনা সাজাতে শুরু করলো আরেকজন। সে বাইরে ওঁত পেতে আছে। তার বুকে জ্বলছে হিংসা আর প্রতিশোধের আগুন; সে—অভিশপ্ত ইবলিস। সে দেখছিল আদমের এই সুখ, এই প্রশান্তি। আর মনে মনে শপথ নিচ্ছিল, যেভাবেই হোক সে এই সুখ কেড়ে নেবে। আদমের এই শান্তির নীড় সে ভেঙে চুরমার করে দেবেই। তার সমস্ত লক্ষ্য এখন কেন্দ্রীভূত হলো ওই একটিমাত্র নিষিদ্ধ গাছের দিকে। তারপর?
.
রেফারেন্স:
[১] কাসাসুল আম্বিয়া, ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.); তাফসীর ইবনু আবি হাতিম।
[২] তাফসীর ইবনে কাসীর, সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত ১৮৯-এর ব্যাখ্যা।
[৩] সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১।
[৪] সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং: ৩৩৩১; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৪৬৮।
[৫] সূরা ত্বোয়া-হা, আয়াত: ১১৮-১১৯।
[৬] সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত: ১৯।