আদম (আ.)এর মৃত্যু ও শেষ উপদেশ

কেমন ছিল সেই অন্তিম মুহূর্তগুলো? হাজার বছরের দীর্ঘ সফর শেষে পৃথিবীর বুকে যখন আমাদের আদি পিতা আদম (আলাইহিস সালাম)-এর বিদায়বেলা ঘনিয়ে এলো তখন কী ভেসে উঠছিল তার সামনে?

তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠছিল এক মহাকাব্যিক জীবন—জান্নাতের সেই অনিন্দ্য সুন্দর প্রথম প্রভাত, হাওয়া (আঃ)-এর সান্নিধ্যে খুঁজে পাওয়া প্রথম ভালোবাসা, একটি ভুলের অনুতাপে ঝরে পড়া প্রথম অশ্রু, আরাফাতের ময়দানে পুনর্মিলনের সেই আবেগঘন মুহূর্ত, হাবিলের রক্তে ভেজা পৃথিবীর মাটি, আর অগণিত সন্তানের কোলাহলে মানবজাতির গোড়াপত্তন। এই হাজার বছরের প্রতিটি স্মৃতি আজ তাঁর ক্লান্ত চোখের সামনে জীবন্ত। [১]

জীবনের সায়াহ্নে এসে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁর নশ্বর শরীর দুর্বল হয়ে আসছিল, কিন্তু তাঁর আত্মা যেন আরও বেশি করে জেগে উঠছিল নিজের উৎসের পানে ফিরে যাওয়ার জন্য। হাজার বছর পরেও তাঁর অন্তরে লেগে ছিল জান্নাতের সেই অমিয় স্বাদ। একদিন তিনি তাঁর সন্তানদের ডেকে সেই জান্নাতের ফল খাওয়ার এক তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। এই আকুতির গল্পটি আমাদের কাছে পৌঁছেছে ঐতিহাসিক বর্ণনার পথ ধরে। যদিও এর সনদ বা বিশুদ্ধতা নিয়ে আলেমদের মধ্যে পর্যালোচনা রয়েছে, তবে এর মাঝে লুকিয়ে থাকা শিক্ষাটি অত্যন্ত গভীর। [২] এটি কোনো সাধারণ ফলের আকাঙ্ক্ষা ছিল না, বরং ছিল নিজের আসল বাড়ির জন্য, মহান রবের সান্নিধ্যের জন্য এক নবীর অন্তরের আকুতি।

বাবার এই শেষ ইচ্ছা পূরণের জন্য তাঁর সন্তানেরা ব্যাকুল হয়ে বেরিয়ে পড়লেন। কিন্তু তাঁরা কী করে জানবেন, যে ফল তাঁদের পিতা চেয়েছেন, তা এই পৃথিবীর কোনো বাগানে ফোটে না? ফলের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে একসময় একদল ফেরেশতার সাথে তাঁদের দেখা হলো। ফেরেশতাদের নূরানী অবয়ব দেখে সন্তানেরা বিস্মিত হলেন। ফেরেশতারা তাঁদের প্রশ্ন করলেন, “হে আদমের সন্তানেরা, তোমরা কী খুঁজছো?” তাঁরা উত্তর দিলেন, “আমাদের পিতা অসুস্থ এবং তিনি জান্নাতের ফল খেতে চেয়েছেন।” ফেরেশতারা স্নিগ্ধ কিন্তু গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “তোমরা ফিরে যাও। তোমাদের পিতার জন্য যা প্রয়োজন, তা আমাদের কাছেই আছে।”

সন্তানেরা যখন ফেরেশতাদের নিয়ে ঘরে ফিরলেন, মা হাওয়া’র অন্তরটা এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠলো। তিনি ফেরেশতাদের মধ্যে চিনতে পারলেন মালাকুল মউতকে—মৃত্যুর ফেরেশতাকে। যে সঙ্গীর সাথে তিনি জান্নাতে চোখ মেলেছিলেন, যাঁর হাত ধরে পৃথিবীর বুকে প্রথম পথ চলেছিলেন, যাঁর সাথে ভাগ করে নিয়েছেন জীবনের প্রতিটি সুখ-দুঃখ, সেই প্রিয়তম সঙ্গীকে হারানোর ভয়ে তাঁর ভেতরটা হাহাকার করে উঠলো। তিনি আদম (আঃ)-কে আড়াল করে দাঁড়ালেন, যেন পৃথিবীর সমস্ত শক্তি দিয়ে তাঁকে আগলে রাখবেন।

কিন্তু আদম (আঃ) স্মিত হেসে তাঁর হাত ধরলেন। পরম শান্ত ও গভীর কণ্ঠে বললেন, “আমার ও আমার রবের দূতের মাঝ থেকে সরে যাও।” তাঁর কণ্ঠে কোনো ভয় ছিল না, ছিল কেবল ঘরে ফেরার আনন্দ। তিনি জানতেন, এই বিদায় কোনো সমাপ্তি নয়, বরং এক নতুন সূচনার দ্বার।

এরপর তিনি তাঁর সন্তানদের শেষবারের মতো কাছে ডাকলেন। তাঁর বিছানাকে ঘিরে তখন মানবজাতির প্রথম প্রজন্ম। অশ্রুসজল চোখে তারা তাকিয়ে আছে তাদের পিতা, নেতা ও প্রথম নবীর দিকে। আদম (আঃ) তাঁর শেষ উপদেশ দিলেন, যা ছিল মানবজাতির জন্য প্রথম ওসিয়ত:

“আমার সন্তানেরা, আমি তোমাদেরকে আল্লাহর উপর ভরসা রাখার উপদেশ দিচ্ছি। তাঁর অবাধ্য হয়ো না। জেনে রেখো, আল্লাহ তোমাদের কখনো একা ছেড়ে দেবেন না। তিনি যুগে যুগে তোমাদের পথ দেখানোর জন্য নবী ও রাসূল পাঠাবেন। তাঁদের সকলের মূল বার্তা হবে একটাই—কেবলমাত্র এক আল্লাহর ইবাদত করা এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করা। শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু, তার ধোঁকা থেকে সর্বদা সতর্ক থেকো।” [৩]

অবশেষে এলো সেই পরম মুহূর্ত। শুক্রবারে, যেই দিনে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই দিনেই তাঁর পার্থিব সফরের ইতি ঘটলো। [৪] ফেরেশতারা পরম সম্মানে তুলে নিলেন মানবজাতির প্রথম আত্মা। এরপর তাঁরা নিজেরাই তাঁর গোসল, কাফন এবং দাফনের কাজ সম্পন্ন করলেন। জানাযার সালাত পড়লেন এবং সন্তানদের শিখিয়ে দিলেন শেষ বিদায়ের এই সম্মানিত বিধান।

পৃথিবীর মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন আমাদের আদি পিতা। কিন্তু তাঁর গল্প কি এখানেই শেষ? তাঁর দীর্ঘ জীবন ছিল এক মহাকাব্য—সৃষ্টির বিস্ময়, ভালোবাসার পূর্ণতা, ভুলের আঘাত, অনুতাপের অশ্রু এবং ক্ষমার সুশীতল ছায়া। কী সেই চূড়ান্ত শিক্ষা, কী সেই শেষ বার্তা, যা তিনি তাঁর প্রতিটি পদচিহ্নে আমাদের জন্য রেখে গেলেন?

.

রেফারেন্স: 

[১] জামি’ আত-তিরমিযী, হাদিস নং: ৩৩৬৮ (হাদিসটি হাসান সহীহ) । এই হাদিসে আদম (আঃ)-এর ১০০০ বছরের জীবনকালের কথা উল্লেখ আছে। 

[২] সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৩৪৬১। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, “তোমরা বনী ইসরাঈল থেকে বর্ণনা করতে পারো, এতে কোনো দোষ নেই।” আলেমগণ এর ব্যাখ্যায় বলেন, কেবল সেইসব বর্ণনা যা কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক নয়। আদম (আঃ)-এর অসুস্থতার বর্ণনাটি ঐতিহাসিক সূত্রে প্রাপ্ত এবং এর সনদ নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। 

[৩] উপদেশের বিষয়বস্তু বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থ, যেমন ইমাম ইবনে কাসীরের ‘আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া’ থেকে সংকলিত, যা কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক শিক্ষার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। 

[৪] সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ৮৫৪।

Leave a Reply