মৃত্যুর সংজ্ঞা ও দাফনের শিক্ষা

একবার ভাবুন তো সেই পৃথিবীর কথা, যেখানে ইতিপূর্বে ‘মৃত্যু’ নামক কোনো শব্দের অস্তিত্ব ছিল না। মানুষের অনন্তকালের জান্নাত থেকে বিতাড়িত হওয়ার অভিজ্ঞতা থাকলেও জীবনের ইতি ঘটার, চিরতরে নীরব হয়ে যাওয়ার কোনো ধারণা কারো তখনও ছিল না। সেই পৃথিবীতেই প্রথমবারের মতো ঘটলো এক অভাবনীয়, বিভীষিকাময় ঘটনা। ভাইয়ের হাতে প্রাণ হারালো আপন ভাই!

ক্রোধের আগুন যখন নিভে এলো, কাবীলের হুঁশ ফিরলো। তার চোখের সামনে পড়ে রইলো হাবিলের নিথর দেহ—এক ভয়ংকর নীরবতা। তার ভাই আর কথা বলছে না, নড়ছে না, শ্বাস নিচ্ছে না। বিজয়ীর অহংকার এক মুহূর্তে উবে গিয়ে তার স্থান নিল এক অসহনীয় ভার আর এক পরম শূন্যতা। এই শূন্যতার নামই যে মৃত্যু, তা সে জানতো না। সে কী করবে এই নিথর দেহ নিয়ে? কোথায় লুকাবে নিজের অপরাধের এই অমোচনীয় চিহ্ন? পৃথিবীর প্রথম হত্যাকারী তখন দিশেহারা, তার কাঁধে পৃথিবীর প্রথম মৃতদেহ।

এই চরম অসহায়ত্বের মুহূর্তে পরম করুণাময় আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির প্রতি এক অপার শিক্ষা প্রেরণ করলেন। তিনি দুটি কাক পাঠালেন। কাবীলের চোখের সামনেই কাক দুটি তুমুল ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়ল এবং এক পর্যায়ে একটি অন্যটিকে হত্যা করে ফেলল। এরপর জীবিত কাকটি তার ঠোঁট আর পা দিয়ে মাটি খুঁড়তে শুরু করল এবং নিহত সঙ্গীর দেহটি সযত্নে সেই গর্তে চাপা দিয়ে দিল।

এই দৃশ্য ছিল মানবজাতির জন্য প্রথম ব্যবহারিক শিক্ষা। একটি পাখিও তার সঙ্গীর মরদেহের প্রতি সম্মান দেখাচ্ছে, তাকে অরক্ষিত ফেলে রাখছে না। তীব্র লজ্জায় আর আফসোসে কাবীল বলে উঠল, “হায় আফসোস! আমি কি এই কাকটির মতোও হতে পারলাম না যে আমার ভাইয়ের মৃতদেহ লুকাতাম?” [১] অতঃপর সে কাকের কাছ থেকে শেখা পদ্ধতিতে মাটি খুঁড়ে তার ভাই হাবিলকে দাফন করলো। এভাবেই পৃথিবীর বুকে প্রথম কবরের রচনা হলো এবং দাফনের মতো এক সম্মানিত প্রথার গোড়াপত্তন হলো।

এই একটি ঘটনা থেকে কতকিছুই না শেখার রয়েছে! কাবীলের আফসোস ছিল নিজের জন্য, নিজের অসহায়ত্বের জন্য। এই অনুশোচনায় নিজের ভুলের দায়ভার ছিল, কিন্তু সেই ভুলের ক্ষমা চাওয়ার আকুতি ছিল না, যা হলো সত্যিকারের অনুতাপ বা তওবা।

কেমন ভিন্ন ছিল কাবীলের পিতামাতার সেই প্রথম ভুল? তাঁরা ভুলের পর আশ্রয় খুঁজেছিলেন আল্লাহরই করুণায়, বলেছিলেন, ‘হে আমাদের রব, আমরা আমাদের নিজেদের উপর জুলুম করেছি…’। কিন্তু কাবীলের অনুশোচনা তাকে আল্লাহর কাছ থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিল, ঠিক যেমন অহংকার দূরে সরিয়ে দিয়েছিল ইবলিসকে। [২]

পৃথিবীর বুকে ঝরে পড়া এই প্রথম রক্তের দাগ এতটাই গভীর ছিল যে, স্বয়ং আল্লাহ একে সমগ্র মানবতাকে হত্যার সাথে তুলনা করেছেন। [৩] যে ঈর্ষার আগুন একদিন ইবলিসকে আল্লাহর রহমত থেকে বিতাড়িত করেছিল, সেই আগুনেরই একটি স্ফুলিঙ্গ আজ ভাইয়ের হাতে ভাইয়ের রক্ত ঝরালো। অন্তরের ছোট ছোট পাপের স্ফুলিঙ্গ থেকেই যে বড় বড় ধ্বংসের আগুন জ্বলে ওঠে, মানবজাতি তা প্রথমবার উপলব্ধি করলো। [৪]

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, “যাকেই অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়, তার রক্তের একাংশ আদমের প্রথম সন্তানের (কাবীলের) উপর বর্তায়, কারণ সেই সর্বপ্রথম হত্যার প্রচলন করেছিল।” [৫]

হাবিলের এই মর্মান্তিক পরিণতি এবং কাবীলের এই ভয়াবহ পতন আদম ও হাওয়া (আলাইহিমাস সালাম)-এর বুকে গভীর শোকের জন্ম দিল। তাঁরা শুধু একজন সৎ পুত্রকেই হারাননি, বরং তাঁদের চোখের সামনেই শয়তানের ওয়াদার বাস্তব প্রতিফলন দেখেছিলেন। পৃথিবীতে আল্লাহর খলিফা হিসেবে তাঁদের সন্তানদের পথচলা যে কতটা কণ্টকাকীর্ণ হবে, তা তাঁরা সেদিন গভীরভাবে উপলব্ধি করলেন।

মানবজাতি সেদিন প্রথমবার শিখলো, ছেড়ে যাওয়া স্বজনের জন্য শেষ কর্তব্য কী। কিন্তু এই জ্ঞান তাদের অন্তর থেকে মৃত্যুর ভয় দূর করতে পারলো কি? যে আদম (আঃ) নিজের সন্তানের এমন পরিণতি দেখলেন, তিনি নিজে কীভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সেই অবশ্যম্ভাবী যাত্রার জন্য, যাঁর গন্তব্য তাঁর পরম প্রিয় রব?

.

রেফারেন্স:

[১] তাফসীর ইবনে কাসীর ও তাফসীর আত-তাবারী, সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত ৩০-৩১ এর ব্যাখ্যা।

[২] সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ৩১; ইসলামি স্কলারদের মতে, কাবীলের অনুশোচনা ছিল কিন্তু তওবার শর্তগুলো পূরণ হয়নি।

[৩] সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ৩২।

[৪] সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৩৩৩৫; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৬৭৭।

[৫] সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৬৭৭।

Leave a Reply